প্রকাশকাল: ৪ আগস্ট ২০২৬ | মঙ্গলবার | সকাল ৮:৩৪ মিনিট।

Time tv24 | নিজস্ব প্রতিবেদক
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন ১৩০ বছরের মা আর তার প্রায় ১০০ বছরের মেয়েই এখন একে অপরের একমাত্র ভরসা। বয়সের ভারে দুজনই অসহায়। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়, নিজের কাজও ঠিকমতো করতে পারেন না। তবুও একজন আরেকজনকে আগলে রেখে বেঁচে আছেন। দীর্ঘদিন ধরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গড়মাটি গ্রামের একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরেই কাটছিল তাদের দিন-রাত। অবশেষে মানবিক মানুষের সহযোগিতায় বদলে গেছে তাদের জীবনের গল্প। তারা পেয়েছেন একটি নিরাপদ নতুন ঘর।
এই দুই শতবর্ষী মা-মেয়ে হলেন ফাতেমা বেগম ও তার মেয়ে মানিকজান। স্থানীয়দের কাছে তারা বহু বছর ধরেই পরিচিত। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও জীবনের নানা স্মৃতি আজও তাদের মনে জাগ্রত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়ে আজ তারা একে অপরের সঙ্গেই জীবনের শেষ সময় পার করছেন।
জানা যায়, স্বাধীনতার পরপরই স্বামীকে হারান ফাতেমা বেগম। এরপর বহু কষ্টে সংসার চালিয়ে যান। প্রায় এক দশক আগে মারা যান তার একমাত্র ছেলে। এরপর থেকেই মা-মেয়ে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করলেও তাদের জীবন ছিল চরম কষ্টে ভরা। দারিদ্র্য, বার্ধক্য এবং অনিশ্চয়তা যেন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল।
জাতীয় পরিচয়পত্রে তাদের বয়স কম উল্লেখ থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ফাতেমা বেগমের প্রকৃত বয়স ১২৫ থেকে ১৩০ বছরের মধ্যে। আর তার মেয়ে মানিকজানের বয়সও প্রায় ১০০ বছর। গ্রামের প্রবীণরা জানান, কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা এই পরিবারকে দেখে আসছেন। দীর্ঘ জীবনের সাক্ষী এই মা-মেয়ের গল্প এখন পুরো এলাকায় আলোচনার বিষয়।
তাদের বসবাসের ঘরটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। টিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি জরাজীর্ণ সেই ঘরের ছাদ দিয়ে বৃষ্টি হলেই পানি পড়ত। ঝড়-বৃষ্টি এলেই ভয়ে কাটাতে হতো রাত। যে কোনো সময় ঘরটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যেই দিন পার করতেন তারা।
প্রতিবেশীরা নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। কেউ খাবার এনে দিতেন, কেউ ওষুধ কিনে দিতেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় কাজে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু একটি টেকসই ঘর নির্মাণের মতো সামর্থ্য কারও ছিল না। ফলে বহু বছর ধরেই নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়।
এমন সময় তাদের অসহায় জীবনের খবর পৌঁছে যায় মানবিক সেবা ফাউন্ডেশন-এর কাছে। সংগঠনটির সদস্যরা প্রথমে তাদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন এবং খাদ্যসামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেন। পরে সরেজমিনে তাদের বসতঘরের বেহাল অবস্থা দেখে একটি নিরাপদ ও টেকসই ঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
সংগঠনের উদ্যোগে দ্রুতই শুরু হয় নির্মাণকাজ। অল্প সময়ের মধ্যেই মা-মেয়ের জন্য একটি নতুন, নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য ঘর নির্মাণ করা হয়। নতুন ঘরের চাবি হাতে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন ফাতেমা বেগম ও মানিকজান। জীবনের শেষ বয়সে এমন একটি উপহার তাদের কাছে যেন নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।
নতুন ঘরে উঠে মা-মেয়ে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে অতীতের নানা স্মৃতিচারণ করেন। শৈশব, সংসার, স্বামী-সন্তান হারানোর বেদনা, অভাব-অনটনের দীর্ঘ জীবন—সবকিছু বলতে বলতে তাদের চোখ ভিজে ওঠে। তবে এবার সেই চোখে ছিল স্বস্তির হাসিও। কারণ বহু বছরের কষ্টের পর অন্তত একটি নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই মা-মেয়ের জীবন সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনন্য উদাহরণ। শত কষ্টের মধ্যেও তারা কখনো মানুষের কাছে হাত পাতেননি। যা পেয়েছেন, তাই নিয়েই জীবন কাটিয়েছেন। তাই মানবিক সেবা ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ পুরো এলাকায় প্রশংসিত হয়েছে।
এলাকাবাসীর মতে, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন এবং মানবিক মানুষ যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে দেশের বহু দরিদ্র ও আশ্রয়হীন মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে। একটি নিরাপদ ঘর শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, এটি একজন মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং বেঁচে থাকার সাহসও এনে দেয়।
ফাতেমা বেগম ও মানিকজানের গল্প কেবল দুই অসহায় মানুষের জীবনের কাহিনি নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনের প্রায় পুরোটা সময় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কাটানোর পর শেষ বয়সে একটি নিরাপদ আশ্রয় তাদের মুখে যে হাসি ফিরিয়েছে, সেটিই প্রমাণ করে—মানুষ মানুষের জন্য। সামান্য সহায়তাও কারও জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।






