
প্রকাশকাল: ১০ আগস্ট ২০২৬ | সোমবার | বিকেল ৫টা ২৪ মিনিট
নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। এবার দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ফলাফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ উত্তীর্ণ হয়েছে, অন্যদিকে বেশ কিছু সূচকে উদ্বেগজনক চিত্রও উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
এবার সারা দেশে মোট ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিপরীতে ৬৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। তবে গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৯৮৪টি। অর্থাৎ শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও এবার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ
দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফলাফলে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে।
ছাত্রীদের পাসের হার ৬৭ দশমিক ৯১ শতাংশ, আর ছাত্রদের পাসের হার ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের তুলনায় ৮ দশমিক ১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
তবে সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৪৮টি। ফলে এ বছর শূন্য পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
দাখিলে পাসের হার ৫৫.৪৯ শতাংশ
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষায় এবার গড় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এখানেও ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে।
এসএসসি ও সমমানের সামগ্রিক ফলাফলে দাখিলের ফলও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ফলাফল উন্নয়নে বিষয়ভিত্তিক পাঠদান, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জিপিএ-৫ কমেছে
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৯ জন কমেছে।
শুধু জিপিএ-৫-এর সংখ্যা দিয়ে শিক্ষার সামগ্রিক মান বিচার করা যায় না। তবে প্রতিবছরের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনের প্রবণতায় পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেছিল ১৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিতে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফল দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।
তবে ফলাফলের সামগ্রিক হার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলের বড় পার্থক্যও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সময়ে কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হচ্ছে না—এই বৈপরীত্যের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
৩১২ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস: কেন এমন ফল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি?
এর উত্তর একক কোনো কারণে পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পড়াশোনার পরিবেশ, শিক্ষকসংকট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান, অভিভাবকদের সহযোগিতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে এসব কারণ অনুমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ না করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি দুর্বল ছিল, কতজন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, তাদের আগের পরীক্ষার ফল কেমন ছিল এবং প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত পাঠদান ও একাডেমিক তদারকি কতটা কার্যকর ছিল—এসব তথ্য পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত কারণগুলো স্পষ্ট হতে পারে।
শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করলে সমাধান হবে না
কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে তার নিজের প্রস্তুতির ঘাটতি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী যদি ব্যর্থ হয়, তখন বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কারণ একটি শিক্ষার্থীর ফলাফলের পেছনে পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে কি না, শিক্ষকরা যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কি না, দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে শূন্য পাস করা ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তদন্ত ও একাডেমিক মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ তদারকি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অতিরিক্ত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানও কমেছে
অন্যদিকে, এবার ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৯৮৪। অর্থাৎ শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে ৩১৫টি।
এই পরিবর্তনের কারণও বিশ্লেষণ করা দরকার। কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান ভালো ফল করেছে, তাদের পাঠদানের পদ্ধতি কী, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন এবং শিক্ষক-অভিভাবক সমন্বয় কতটা কার্যকর—এসব ইতিবাচক অভিজ্ঞতা অন্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
বিদেশের কেন্দ্রগুলোতে পাসের হার ৮৮.০৬ শতাংশ
বাংলাদেশের বাইরে ৯টি কেন্দ্রে এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কেন্দ্রে মোট ৪০২ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ৩৫৪ জন পাস করেছে। বিদেশের কেন্দ্রগুলোতে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৮৮ দশমিক ০৬ শতাংশ।
ফল পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ
ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী অসন্তুষ্ট হলে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা যাবে।
ফলাফল থেকে শিক্ষা নেওয়াই এখন মূল বিষয়
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫-এর পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
একদিকে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, অন্যদিকে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হয়নি। আবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে। এসব তথ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি, শিক্ষকতার মান, পারিবারিক সহায়তা এবং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় শুধু তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। একইভাবে শুধু শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানকেও দায়ী করাও যথেষ্ট নয়। বরং শিক্ষার্থী, পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রশাসন—সব পক্ষের দায়িত্ব ও ভূমিকা পর্যালোচনা করে কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা চিহ্নিত করতে হবে।
বিশেষ করে শূন্য পাস করা ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে যদি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, নিয়মিত তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক সহায়তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ফলাফল কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
কারণ একটি পরীক্ষার ফল শুধু একটি বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব নয়; এটি আগামী প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।





