
বাবার লাশ বাড়িতে রেখে পরীক্ষা, এসএসসিতে জিপিএ-৫ ঋতুর
বাবাকে হারানোর শোক নিয়েই এসএসসির বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করেছিল ঋতু খাতুন। ফল প্রকাশের পর মানবিক বিভাগ থেকে পেয়েছে জিপিএ-৫। তবে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে এখন তার উচ্চশিক্ষা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের ঋতু খাতুন ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে অংশ নেয়। সে মৃত কবির হোসেন ও রেহেনা খাতুন দম্পতির দুই মেয়ের মধ্যে ছোট। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
পরিবার ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই ঋতুর বাবা কবির হোসেন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। অসুস্থ বাবাকে বাড়িতে রেখেই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিল ঋতু। পরীক্ষা চলাকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
১০ মে ছিল ঋতুর ইতিহাস পরীক্ষা। ওই দিন ভোররাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার বাবা কবির হোসেন। সকালে তাঁর মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলেও পরিবারের সদস্যরা ঋতুকে বাবার মৃত্যুর খবর জানাননি। তাঁদের একমাত্র চিন্তা ছিল—মেয়েটি যেন পরীক্ষাটি নির্বিঘ্নে দিতে পারে।
চৌগাছা শহরের ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে যায় ঋতু। হাকিমপুর গ্রামের বাড়ি থেকে কেন্দ্রটির দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। ঋতু যখন পরীক্ষার হলে বসে, তখন বাড়িতে নেওয়া হচ্ছিল তার বাবার মরদেহ।
পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে ঋতু জানতে পারে, তার বাবা আর নেই। শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখে বিদায় জানায় সে। এরপর বুকভরা শোক নিয়েই আবার বসতে হয় পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।
বাবাকে হারানোর সেই গভীর শোক নিয়েই এসএসসির বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করে ঋতু। সোমবার (১০ আগস্ট) ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
ফলাফল প্রকাশের পর ঋতু জানায়, বাবা বেঁচে থাকলে তার ফলাফল দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া ও প্রার্থনা চেয়েছে সে। একই সঙ্গে বাবার অবর্তমানে নিজের উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কার কথাও জানিয়েছে ঋতু।
হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহানাজ পারভীন বলেন, ঋতু খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী। সে ভালো ফল করবে—এ প্রত্যাশা শিক্ষকদের ছিল। অসুস্থ বাবা ও পরিবারের আর্থিক সংকটও তার সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ভবিষ্যতেও ঋতু সাফল্যের স্বাক্ষর রাখবে বলে আশা করেন তাঁরা।
ঋতুর উচ্চশিক্ষার পথ সহজ করতে সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন শাহানাজ পারভীন। তাঁর মতে, ঋতুর জন্য কোনো শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করা গেলে উচ্চশিক্ষার পথ অনেকটাই সহজ হবে।
চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, এটি অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। উপজেলা প্রশাসন এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে। ঋতুর উচ্চশিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ সহায়তা করার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
বাবার মৃত্যুর খবর গোপন রেখে পরীক্ষার হলে বসা, শোককে শক্তিতে পরিণত করে জিপিএ-৫ অর্জন—ঋতুর এই সাফল্য যেন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক অনন্য লড়াইয়ের গল্প।





