ট্রাংক কেটে প্রশ্নপত্র চুরি, কর্মকর্তার চেম্বারেই ফটোকপি; অন্তর্বাসে করে পাচার

দীর্ঘ তদন্ত শেষে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ৫৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযোগপত্রে প্রশ্নপত্র চুরির কৌশল, ফটোকপি, পাচার ও অর্থ লেনদেনের বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন কুমার সাহা ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। তাঁদের মধ্যে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের পৃথক অনুসন্ধান চলছে। ৫৫ আসামির মধ্যে ২৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন কারাগারে রয়েছেন এবং আবেদ আলী, সিয়ামসহ ২৫ জন জামিনে আছেন। অপর ২৯ জন এখনো পলাতক।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে সিআইডি। তবে মো. গোলাম হামিদুর রহমান, হামিদুল ইসলাম জিয়া, মো. মাহাবুব আলম ও আজাদ নামে চারজন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাঁদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা নিশ্চিত করা যায়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৯ জুলাই পল্টন থানায় মামলাটি করেন সিআইডির উপপরিদর্শক নিপ্পন চন্দ্র চন্দ। পরে আদালত পলাতক আসামিদের নাম পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশের নির্দেশ দেন।

কর্মকর্তার চেম্বারে ট্রাংক কেটে প্রশ্নপত্র চুরি

সিআইডির তদন্তে প্রশ্নপত্র চুরির অন্যতম চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় পিএসসির অফিস সহায়ক মো. সাজেদুল ইসলামকে ঘিরে। তদন্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র চুরির পরিকল্পনায় তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন।

পিএসসির কর্মকর্তা গোলাম ফারুকের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সাজেদুল ঝাড়ুদার রূপন চন্দ্র দাসের কাছ থেকে চাবি নিয়ে তাঁর চেম্বারে প্রবেশ করেন। এরপর হ্যাকসো ব্লেড দিয়ে ট্রাংকের তালা কেটে ভেতর থেকে ফাইনাল মডারেশনের চার সেট হাতে লেখা প্রশ্নপত্র বের করেন।

প্রশ্নপত্র বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি চেম্বারে থাকা অফিসের ফটোকপি মেশিন ব্যবহার করে চার সেট প্রশ্নপত্রের কপি করেন। পরে মূল প্রশ্নপত্রগুলো ট্রাংকে রেখে তালা লাগিয়ে দেন।

তদন্ত অনুযায়ী, প্রশ্নপত্রগুলো যাতে এক জায়গা থেকে পুরোপুরি ফাঁস না হয়, সে জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকার কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে অল্প অল্প করে প্রশ্ন কম্পোজ করানো হয়। পরীক্ষার দুই দিন আগে রমনা পার্কের গেটের সামনে চার সেট প্রশ্নপত্রের মোট ৮০০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন আবেদ আলীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে সাজেদুল ৭৫ লাখ টাকা নেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্তর্বাসে লুকিয়ে প্রশ্নপত্র পাচার

তদন্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের আরেকটি স্তর হিসেবে সরকারি বিজি প্রেসের কিছু কর্মীর ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। সিআইডির অভিযোগ অনুযায়ী, বিজি প্রেসের বাঁধাইকর্মী মোহাম্মদ আকরাম হোসেন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মজনু মিয়া প্রশ্নপত্র বাইরে পাচারে জড়িত ছিলেন।

তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র প্যাকেট করার সময় আকরাম কৌশলে বাথরুমে গিয়ে মোবাইল ফোনে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলতেন। কখনো কখনো পুরো প্রশ্নপত্র অন্তর্বাসের ভেতরে লুকিয়ে বাইরে নিয়ে আসতেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে মজনু মিয়াও অন্তর্বাসে প্রশ্নপত্র লুকিয়ে বাইরে নিয়ে যেতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সব সেট বিজি প্রেস থেকে আকরাম ও মজনুর মাধ্যমে বাইরে আসে এবং পরে তা এ টি এম গোলাম মোস্তফা ও মিজানুর রহমানের কাছে সরবরাহ করা হয় বলে সিআইডির তদন্তে বলা হয়েছে।

বরখাস্তের পর পুনর্বহাল হয়ে ফের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ

মামলার ৩ নম্বর আসামি মো. খলিলুর রহমান ২০০৫ সাল থেকে পিএসসিতে ডেসপাচ রাইটার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১২ সালে ৩৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তিনি গ্রেপ্তার ও চাকরিচ্যুত হন। পরে ২০২২ সালে তিনি পিএসসির চাকরিতে পুনর্বহাল হন।

সিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, পুনর্বহালের পর খলিলুর আবারও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পাশাপাশি সাজেদুল ইসলামকে ৩৫ লাখ টাকা দেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পরীক্ষার আগের দিন তিনি সাজেদুলের কাছে ৯৮ জন পরীক্ষার্থী দেন বলেও তদন্তে বলা হয়েছে।

গ্রেপ্তারের সময় খলিলুরের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, প্রবেশপত্র, বহুনির্বাচনী প্রশ্ন, চেক, স্ট্যাম্প, একটি ডায়েরি ও নোট খাতা জব্দ করা হয়। ডায়েরিতে প্রার্থীদের নাম, মোবাইল নম্বর, লেনদেনের টাকা ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরের হিসাব পাওয়া গেছে বলে সিআইডি জানিয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বড় অর্থের লেনদেন

তদন্তে আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের তথ্য উঠে এসেছে। আতিকুল ইসলাম, তাঁর ভাই মোজাহেদুল ইসলাম ও মো. নোমান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধেও প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, সরবরাহ এবং প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, নোমান সিদ্দিকীর নিজের ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১৪টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২ কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অর্থে তিনি আশুলিয়ায় ‘ইত্তেহাদ ফ্যাশন অ্যান্ড অ্যাপারেলস’ নামে একটি তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে তোলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদ আলীর ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি টাকার সন্ধান

তদন্তে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, আবেদ আলী সরকারি চাকরির নিয়োগ ও পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী পরীক্ষায় ৪৪ জন প্রার্থীর কাছ থেকে তিনি প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম নেন বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইডি আবেদ আলীর নিজের ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সন্ধান পেয়েছে বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

তবে অভিযোগপত্রে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, সেগুলো তদন্ত সংস্থার অভিযোগ ও আদালতে উপস্থাপিত নথির অংশ। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো আসামিকে দোষী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

Newsletter Updates

Enter your email address below and subscribe to our newsletter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *