“আমি কি বিধবা! আমার বিধবা হওয়ার বয়স হয়েছে?”—ঢাকা মেডিকেলে স্বামীর নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই এই প্রশ্নই বারবার করছিলেন ২২ বছরের মারিয়া সুলতানা রাখি।
চব্বিশের ১৮ জুলাই হাতজোড় করে কথা গুলো বলছিলেন মারিয়া সুলতানা রাখি। ঢাকা মেডিকেলে স্বামীর লাশ সামনে রেখে হতবিহ্বল মারিয়া সুলতানা রাখি সেদিন বারবার শুধু একই কথা বলছিলেন।
কখনো অঝোরে কেঁদেছেন, আবার কখনো ফুঁসে উঠেছেন রাগে-ক্ষোভে। আবার মাঝে মধ্যে তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছিলো না আন্দোলনে গিয়ে মারা গেছেন তার স্বামী। চিৎকার করে কান্নাজাড়িত কণ্ঠে মারিয়া সুলতানা বলতে থাকেন, ‘আমি এতোগুলো বছর কীভাবে কাটাবো? নুজাইরার আব্বু, আমরা এখন কীভাবে বাঁচবো? প্লিজ ওঠো, ওঠো!’ তার সেদিনের সেই চিৎকার আর আহাজারির ভিডিও পরে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে।
২০২৪ সাল থেকে এখন ২০২৬। মাঝখানে দুই বছর। কিন্তু স্বামীর জন্য মারিয়া সুলতানার সেই যে হাহাকার, সেটা কমেনি এখনো। তিনি বলেন, ‘আমার হাজবেন্ডকে আমার খুব প্রয়োজন ছিলো। আমার মেয়ের জন্যও প্রয়োজন ছিল। কারণ আমার বাবা মারা গেছে যখন, তখন আমার ছয় বছর বয়স। আমার কোনো ভাইও ছিলো না। আমি সবসময় আল্লাহকে বলতাম, আল্লাহ আমার গার্ডিয়ান (অভিভাবক) বলতে একজনই আছে, তাকে আপনি কোনদিন নিয়েন না! কিন্তু আল্লাহ তাকেও নিয়ে গেলো!’
মারিয়া সুলতানার দুই বছর বয়সী কন্যার এখন চার বছর বয়স। বাবা নেই, এই কথাটি তাকে এখনো বলা হয়নি। সে জানে তার বাবা বাইরে আছে। কিন্তু যখন বোঝার বয়স হবে, তখন মেয়েকে সত্যটা কীভাবে জানাবেন- সেটা ভেবেই কূল পাননা মারিয়া সুলতানা। তিনি বলছিলেন, ‘আমি যখন বাসার বাইরে যাই, তখন সে আমাকে বলে, আম্মু আসার সময় কিন্তু ড্যাডিকে (বাবা) নিয়ে আসবে। এরপর যখন বাসায় ফিরি তখন বলে, আমার ড্যাডিকে আনো নাই কেন? তখন আমি কথা ঘুরায় দেই।’
মারিয়া সলতানা জানান, তার মেয়ে সারাক্ষণ বাবাকে খুঁজতে থাকে। সে বাবা বলে ডাকতে চায়। ‘আমার বোনের হাজবেন্ডকে সে বাবা ডাকে। ওদের ছোট ছোট বাচ্চারা যেহেতু তাদের আব্বুকে বাবা ডাকে। সে তো বোঝে না যে তার আঙ্কেল হয়। সে-ও ওদের বাবাকে বাবা বলে ডাকে।’ কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন মারিয়া।
স্বামী না থাকায় এখন সংসারের সব কাজ মারিয়াকে একাই সামলাতে হয়। তিনি বলেন, আমি রাস্তা পার হতে পারতাম না। আমার স্বামী হাত ধরে রাস্তা পার করাতো। পেঁয়াজ কাটতে কষ্ট হয় বলে পেঁয়াজও কাটতে দিতো না। সবসময় আমাকে আগলে রাখতো। এখন সেই আমি সব কাজ একাই করি। রাস্তায় বের হই, হাসপাতাল যাই, বাজারে যাই। যখন মাছ বাজারে যাই মাছ কিনতে, আমার চোখের পানি আটকাতে পারি না।

ফাইল ছবি: মারিয়া সুলতানা রাখি




