প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০২৬ | শুক্রবার | রাত ৮:৪৪ মিনিট

মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে স্পেনের সিউটায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন অভিবাসীরা। ছবি: সংগৃহীত
উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেন-শাসিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিউটা আবারও বড় ধরনের অভিবাসী সংকটের মুখে পড়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মরক্কো থেকে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রপথে সাঁতরে, ছোট নৌকায় এবং সীমান্তের উঁচু বেড়া টপকে স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন। আকস্মিক এই গণ-অনুপ্রবেশে সীমান্ত এলাকায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এ ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে সিউটায় প্রবেশ করেছেন প্রায় ৪৯ হাজার অভিবাসী।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। হাজার হাজার মানুষ একযোগে সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়ে বেড়া ভাঙার চেষ্টা করেন। অনেকেই উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে স্পেনের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। সীমান্তে একযোগে এত মানুষের চাপ সৃষ্টি হওয়ায় স্পেনের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে।
সিউটার স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অতিরিক্ত সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী পাঠানোর আবেদন জানায়। আবেদনের পরপরই স্পেন সরকার অতিরিক্ত সেনা, পুলিশ এবং বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট মোতায়েনের ঘোষণা দেয়। সীমান্তজুড়ে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী স্পেনের সিভিল গার্ড সমিতির প্রধান রশিদ সবিহি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর ভাষায়, “চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কতজন সীমান্ত অতিক্রম করেছেন, তার সঠিক সংখ্যা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পার হচ্ছেন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত চাপের মধ্যে রয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রপথে সাঁতরে কিংবা সীমান্তের বেড়া টপকে স্পেনে প্রবেশ করছেন। সৈকত, রাস্তা এবং খোলা জায়গায় অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশুকে হাঁটতে দেখা গেছে। অনেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত অবস্থায় নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত কয়েক বছরের মধ্যে এটি সিউটায় সংঘটিত সবচেয়ে বড় অভিবাসী অনুপ্রবেশের ঘটনা। সীমান্তরক্ষী বাহিনী এত বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী, অতিরিক্ত পুলিশ এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগজনক। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিশৃঙ্খলার সময় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকে সমুদ্রে ডুবে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল কয়েকটি মরদেহ পানিতে ভাসতে দেখেছে। এছাড়া চলতি বছরেও সিউটায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে কয়েক ডজন অভিবাসীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে সিউটার অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলো ইতোমধ্যেই ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। হাজার হাজার নতুন আগন্তুকের কারণে আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিক সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে স্পেন ও মরক্কো দ্রুত কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনায় বসেছে। দুই দেশ অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমকারীদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বলে জানা গেছে। মরক্কো সীমান্তে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং নতুন করে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিউটা ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত হলেও এটি স্পেনের অংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে মরক্কো থেকে বহু মানুষ উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে প্রবেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে সিউটাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য এবং সীমান্ত নীতিতে পরিবর্তনের গুজব এই অভিবাসী ঢলের অন্যতম কারণ। উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের আশায় ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন হাজার হাজার মানুষ।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালেও সিউটায় একই ধরনের বড় অভিবাসী সংকট দেখা দিয়েছিল। এবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় ইউরোপজুড়ে আবারও অভিবাসন নীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মানবিক দায়িত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো স্পেন সরকারের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিবাসীদের নিরাপত্তা, আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনার জন্য শুক্রবার সিউটা সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কার। একই সঙ্গে সিউটার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হুয়ান জেসুস ভিভাস জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও এখন অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে সিউটার পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং নতুন করে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে টহল জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করছে এই সংকটের পরবর্তী পরিস্থিতি।




