প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬ | বৃহস্পতিবার | সময়: রাত ১:১৫ মিনিট

ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
নিজস্ব প্রতিবেদক | টাইম টিভি২৪
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অস্বস্তি দূর করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌম সমতা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যে ইতিবাচক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্কে যে কিছু অস্বস্তি রয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে নিরসনের প্রয়োজনীয়তা উভয় পক্ষই উপলব্ধি করছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন।
প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক
বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এটি ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।
কূটনৈতিক মহলে এই সাক্ষাৎকে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভূত বিভিন্ন ইস্যুর পর এই বৈঠককে ইতিবাচক বার্তা বহনকারী পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
অস্বস্তি দূর করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দুটি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে কিছু “ইরিটেশন” বা অস্বস্তি রয়েছে। তবে এসব বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক যেন ভবিষ্যতে পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণ, সার্বভৌম সমতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে “বাংলাদেশ প্রথম” নীতির প্রতিফলন অব্যাহত থাকবে এবং সেই অবস্থান থেকেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, বৈঠকে কোনো নির্দিষ্ট দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়নি। বরং সামগ্রিকভাবে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক ও কার্যকর করার বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে যা বললেন
সাংবাদিকরা বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করছে।
তিনি বলেন, আমন্ত্রণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সিদ্ধান্ত হলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।
পুশ-ইন ও শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ
সাম্প্রতিক সীমান্তে কথিত “পুশ-ইন” ইস্যু বৈঠকে আলোচনায় এসেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান জানান, এদিন কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে যেসব অস্বস্তির বিষয় রয়েছে, সেগুলো ধাপে ধাপে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ই ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনায় আসবে।
ইতিবাচক বৈঠক বলে মন্তব্য ভারতের হাইকমিশনারের
বৈঠক শেষে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও আলোচনাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আন্তরিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা মতবিনিময় হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনা শুধু কূটনীতি বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ক্রিকেটসহ বিভিন্ন বিষয়ও উঠে এসেছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করলে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আরও অগ্রগতি সম্ভব হবে।
জনগণের সম্পর্কই হবে মূল ভিত্তি
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হওয়া উচিত দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক স্বার্থ এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সম্পৃক্ততা আরও বাড়বে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সহায়ক হবে।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে অবস্থান
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের সময় ঘনিয়ে আসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের হাইকমিশনার জানান, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পৃথক ওয়ার্কিং গ্রুপ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সব ধরনের জটিল বিষয় সমাধান করা সম্ভব বলেই ভারত বিশ্বাস করে।
ভিসা কার্যক্রম নিয়েও আশাবাদ
দীনেশ ত্রিবেদী জানান, ভারত ইতোমধ্যে ভিসা কার্যক্রম চালু করেছে, যা দুই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। তাঁর মতে, ভিসা সহজলভ্য হলে ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা, পর্যটন ও পারিবারিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে এবং উভয় দেশের জনগণ এর সুফল পাবে।
সম্পর্কের নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। যদিও বৈঠকে কোনো নতুন চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি, তবুও অস্বস্তি দূর করে সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা উভয় পক্ষ প্রকাশ করেছে, তা ভবিষ্যতের কূটনৈতিক যোগাযোগের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আগামী মাসগুলোতে উচ্চপর্যায়ের সফর, দ্বিপক্ষীয় সংলাপ এবং যৌথ কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
প্রতিবেদন: টাইম টিভি২৪






