
ছবি: ফরহাদ হোসেন আজাদ
প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬ | বৃহস্পতিবার | রাত ৯:২৭ মিনিট
প্রতিবেদক: Time tv24 ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদকে ঘিরে একটি কথিত অন্তরঙ্গ ভিডিও ভাইরাল হওয়াকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। তবে ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সরকারি বা বিচারিক সিদ্ধান্ত আসেনি।
প্রতিমন্ত্রী শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিও সম্পূর্ণ ভুয়া, বানোয়াট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে এসব তৈরি করে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, ফ্যাক্টচেকভিত্তিক পোর্টাল The Dissent একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তাদের হাতে আসা উচ্চ রেজুলেশনের ২০ সেকেন্ডের একটি শব্দহীন ভিডিও, কয়েকটি স্থিরচিত্র এবং কিছু হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট বিভিন্ন এআই শনাক্তকরণ টুলে পরীক্ষা করেও কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এটিও ভিডিওটির ঘটনাবস্তুর সত্যতা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে না।
পরিচয় মিলেছে বলে দাবি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশটের একটি মোবাইল নম্বর অনুসরণ করে একটি বিকাশ অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া যায়। ওই নম্বরের মালিক হিসেবে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার এক নারীর পরিচয় উঠে আসে। পরবর্তীতে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং স্ক্রিনশটে থাকা শাড়ি পরিহিত ছবিটি তাঁর বলে স্বীকার করেন।
তবে ভাইরাল ভিডিও বা স্ক্রিনশট সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য জানেন না বলে দাবি করেন। একইসঙ্গে প্রতিমন্ত্রীকে চেনেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “একজন এমপিকে চিনবো না কেন।”
ফোনকল নিয়েও প্রশ্ন
The Dissent-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে “FORHAD HOSSAIN AZAD” নামে সংরক্ষিত একটি নম্বর থেকে কল আসে। পরদিন যোগাযোগ করলে প্রতিমন্ত্রী সরাসরি বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য না করে প্রতিবেদককে তাঁর দপ্তরে গিয়ে কথা বলার আমন্ত্রণ জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোন কেটে দেন বলে দাবি করা হয়।
মারিয়া সরকার এলিনের বক্তব্য
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসা মারিয়া সরকার এলিন নামে এক উপস্থাপিকা নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে সব ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, উপস্থাপিকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করায় বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে তাঁর ছবি রয়েছে। সেসব ছবিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তাঁর চরিত্রহননের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এলিন আরও বলেন, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যে ছবি ছড়ানো হচ্ছে, সেটি একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে তোলা সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক ছবি এবং এটি নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তিনি এমন অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
স্থানীয়দের নীরবতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার সংশ্লিষ্ট গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললেও অধিকাংশই প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি হননি। অনেকেই ভিডিও ভাইরালের কথা জানলেও ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন।
বিএনপির পাল্টা অবস্থান
এদিকে পঞ্চগড়ে জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছেন, প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ছড়ানো ভিডিও ও ছবিগুলো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব ছড়িয়ে প্রতিমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা নষ্ট করার চেষ্টা করছে।
বিএনপি নেতারা এই প্রচারণার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি দেবীগঞ্জ, বোদা ও জেলা শহরে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক
ঘটনাটি সামনে আসার পর অনেকেই কয়েক মাস আগে ভাইরাল হওয়া আরেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভিডিওর প্রসঙ্গ টেনে তুলছেন। ফলে সামাজিক মাধ্যমে নৈতিকতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারণা এবং এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার—সবকিছু মিলিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে এআই প্রযুক্তির উন্নতির কারণে ছবি ও ভিডিও যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে কোনো ভিডিও ভাইরাল হলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি কোনো প্রমাণ ছাড়াই সেটিকে ভুয়া বলেও উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। নিরপেক্ষ ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ সম্ভব।
Time tv24-এর পর্যবেক্ষণ
Time tv24-এর স্বাধীনভাবে এই ভিডিও, ছবি বা সংশ্লিষ্ট দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে একদিকে প্রতিমন্ত্রী ভিডিওটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছেন, অন্যদিকে The Dissent তাদের অনুসন্ধানে এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট নারীও অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে।






