প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার | দুপুর ১২:১২ মিনিট | প্রতিবেদক: এ আর এম রহমত উল্লাহ
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর মোড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ফয়সাল আহমেদ শান্ত। আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন তাঁকে শহীদ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। তাঁর মৃত্যু সে সময় দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে পরিবার, সহপাঠী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ছাত্র সংগঠন তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।
ফয়সাল আহমেদ শান্তের পরিচয়
ফয়সাল আহমেদ শান্ত ২০০৫ সালের ২৩ মে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মো. জাকির হোসেন। তাঁদের স্থায়ী বাড়ি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের মহিষাদী গ্রামে।
যদিও তাঁদের পারিবারিক নিবাস বরিশালে, শান্তর বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে চট্টগ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম সরকারি মডেল কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে এইচএসসি শেষ করে ওমরগণি এম.ই.এস. কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হন।
সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে তিনি একজন মেধাবী, ভদ্র, শান্ত স্বভাবের এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরির কোটা-সংক্রান্ত একটি রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে কর্মসূচি পালন করতে থাকেন।
ক্রমেই আন্দোলন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
১৬ জুলাই: মুরাদপুরে সংঘর্ষ
১৬ জুলাই ২০২৪ বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর মোড় এলাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান নেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সেখানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ সময় গুলিবিদ্ধ হন ফয়সাল আহমেদ শান্ত। গুলি তাঁর বুকের ডান পাশে লাগে। ঘটনাস্থলে থাকা সহপাঠীরা দ্রুত তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিভিন্ন মহল শোক প্রকাশ করে এবং ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়।
মায়ের অপেক্ষার অবসান
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যায় শান্তর বাড়ি ফেরার কথা ছিল। তাঁর মা ছেলের জন্য নাস্তা প্রস্তুত করে অপেক্ষা করছিলেন।
কিন্তু অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও শান্ত বাড়ি না ফেরায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে শান্তর কয়েকজন বন্ধু এসে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর একমাত্র ছেলে আর বেঁচে নেই। এই সংবাদে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। পরে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
স্মৃতিতে ফয়সাল আহমেদ শান্ত
বন্ধুদের কাছে শান্ত ছিলেন একজন বিনয়ী ও সহানুভূতিশীল মানুষ। পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক বায়োতে লেখা ছিল—
“যে হৃদয় শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা লালন করে, সে হৃদয় কখনো হতাশ হয় না।”
তাঁর মৃত্যুর পর এই বাক্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই এটিকে উদ্ধৃত করে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বিচার প্রত্যাশা
ফয়সাল আহমেদ শান্তর পরিবার তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়েছে।
বর্ষপূর্তিতে শ্রদ্ধা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহতদের স্মরণে দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা এবং স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
ফয়সাল আহমেদ শান্তও সেই স্মরণে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। তাঁর পরিবার, সহপাঠী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশের এই অধ্যায় সম্পর্কে জানবে এবং নিহতদের আত্মত্যাগ স্মরণে রাখবে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাবলি আলোচনার সময় ফয়সাল আহমেদ শান্তের নামও বারবার উচ্চারিত হয়। তাঁর মৃত্যু আন্দোলনের একটি আলোচিত অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
ট্যাগ: ফয়সাল আহমেদ শান্ত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ১৬ জুলাই ২০২৪, মুরাদপুর, চট্টগ্রাম, কোটা আন্দোলন, আন্দোলনের বর্ষপূর্তি, ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ

ছবি: Time tv24






