প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, সোমবার | রাত ৯:২০ মিনিট
একটি আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হলো আজীবনের শোকে। পরিবারের সঙ্গে হাওরে বেড়াতে গিয়ে মেয়েকে প্রবল স্রোতের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ঢাকায় কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট মো. বাছির উদ্দিন মিলন। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ-মিঠামইন সীমান্তের হাসানপুর ব্রিজসংলগ্ন হাওরে ঘটে যাওয়া এ মর্মান্তিক ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) স্ত্রী, তিন মেয়ে ও কয়েকজন স্বজনকে নিয়ে হাসানপুর ব্রিজসংলগ্ন হাওর এলাকায় বেড়াতে যান বাছির উদ্দিন মিলন। ভ্রমণের একপর্যায়ে সবাই পানিতে নামেন। এ সময় হঠাৎ প্রবল স্রোতে তাঁর মেয়ে সেমন্তী ভেসে যেতে শুরু করলে কোনো দ্বিধা না করে মেয়েকে উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি।
স্বজনদের দাবি, নিজের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি বারবার ধাক্কা দিয়ে মেয়েকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। তবে মেয়েকে রক্ষা করার পর নিজেই তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্বজন ও স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও প্রবল স্রোতের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে প্রায় এক ঘণ্টা পর স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত উঠে আসে তাঁর মেয়ে সেমন্তীর বর্ণনায়। পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে জানা যায়, সেমন্তী বলেন, “সাঁতার কাটার সময় আমায় ধাক্কা দিয়ে ঠিকই ওপরে তুলে দিল বাবা। কিন্তু চোখের সামনে বাবা পানিতে তলিয়ে গেল। আমরা তিনটি ওড়না বেঁধে বাবার দিকে ছুড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু স্রোতের কারণে বাবা ধরতে পারেননি। যদি জানতাম বাবা হারিয়ে যাবে, তাহলে কখনো পানিতে নামতাম না।”
এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অসংখ্য মানুষ শোক ও সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, বাছির উদ্দিন মিলনের সবচেয়ে ছোট মেয়ে সাইয়ারার বয়স মাত্র দুই বছর। বাবার মৃত্যুর বিষয়টি সে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। কবরের পাশে গিয়ে সে শুধু বলেছে, “এখানে আমার বাবা শুয়ে আছে।” এরপর আবার শিশুসুলভ সরলতায় খেলতে চলে যায়। শিশুটির এই সরল আচরণ উপস্থিত স্বজনদের আবেগাপ্লুত করে।
নিহতের বাবা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবু বাক্কার জানান, হাওরে যাওয়ার আগে ছেলে তাঁকে ফোন করে সঙ্গে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তিনি যেতে পারেননি। সেটিই ছিল বাবা-ছেলের শেষ কথা। শোকাহত এই বাবা বলেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা হলো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ।”
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাছির উদ্দিন মিলনের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী গভীর মানসিক আঘাতে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না। বড় দুই মেয়েও শোকে ভেঙে পড়েছে এবং নিয়মিত খাওয়াদাওয়া করতে পারছে না। একই সঙ্গে পরিবারের সামনে দেখা দিয়েছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। তিন মেয়ের লেখাপড়া, সংসারের ব্যয় এবং ব্যাংকের ঋণের চাপ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন স্বজনরা।
এ অবস্থায় পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন। তাদের আশা, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে সহযোগিতা পেলে পরিবারটি এই কঠিন সময় কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারবে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষা মৌসুমে হাওরের বিভিন্ন স্থানে পানির স্রোত অনেক সময় হঠাৎ বেড়ে যায়, যা অনভিজ্ঞদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই হাওর, নদী বা গভীর জলাশয়ে নামার আগে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মো. বাছির উদ্দিন মিলনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতিই নয়, বরং সন্তানের জীবন রক্ষায় একজন বাবার আত্মত্যাগের এক মর্মস্পর্শী স্মৃতি হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং তাদের জন্য দোয়া ও প্রয়োজনীয় সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।

ছবি: বাবা, মা ও তিন মেয়ে (টাইম টিভি২৪)






