
৫ আগস্ট ২০২৬ | বুধবার | সকাল ১০:৩১ মিনিট (বাংলাদেশ সময়)
Time tv24 | বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এমন একটি দিন, যা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হবে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এমন এক গণআন্দোলনে রূপ নেয়, যার পরিণতিতে টানা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। তবে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল পতনের আগের শেষ ৭২ ঘণ্টা—২ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত।
এই অল্প সময়ের মধ্যেই পাল্টে যায় আন্দোলনের ভাষা, কৌশল এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা। একদিকে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা করেন ‘এক দফা’ দাবি, অন্যদিকে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কারফিউ, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনসহ নানা পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতনের আন্দোলন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের প্রথম দিকে দাবি ছিল কেবল কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু আন্দোলনের সময় বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার এবং শক্তি প্রয়োগের অভিযোগে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। এরপর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে থাকে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এসে এটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল না; বরং তা পরিণত হয় সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে।
সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও আন্দোলন থামেনি। বরং ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং ২ আগস্ট সারাদেশে গণমিছিলের ডাক দেয়।
২ আগস্ট: উত্তেজনার নতুন অধ্যায়
২ আগস্ট ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষ জড়ো হন।
সেদিন আন্দোলনের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে পূর্বের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল।
একই দিনে তারা ৩ আগস্ট বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
এদিকে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ওই দিন বাংলাদেশে চলমান সহিংসতায় শিশু নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা বাড়তে থাকে।
এদিন মোবাইল ইন্টারনেটে কয়েক ঘণ্টার জন্য ফেসবুক ও টেলিগ্রাম বন্ধ রাখা হয়। রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
৩ আগস্ট: ‘এক দফা’ ঘোষণায় বদলে যায় আন্দোলনের লক্ষ্য
৩ আগস্ট ছিল পুরো আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানোর দিন।
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন—এখন থেকে তাদের একমাত্র দাবি শেখ হাসিনার পদত্যাগ।
সমাবেশে অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন,
“এ সরকারের কোনোভাবেই আর এক মিনিট ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। শেখ হাসিনাকে শুধু পদত্যাগ করলেই হবে না; বরং খুন, লুটপাট ও দুর্নীতির বিচারও করতে হবে।”
একই সমাবেশ থেকে একটি গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠনের দাবিও জানানো হয়।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভবনের দরজা খোলা রয়েছে। তবে আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন,
“গুলি আর সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো সংলাপ হয় না।”
নাহিদ ইসলামও জানান, সরকারের সঙ্গে আলোচনার সময় শেষ হয়ে গেছে।
একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠান।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরেও হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগও পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
৪ আগস্ট: অসহযোগ আন্দোলন ও দেশজুড়ে সংঘর্ষ
৪ আগস্ট থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন।
সেদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী, পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার মোবাইল ফোর-জি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়।
সন্ধ্যা থেকে ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভাগীয় শহর, জেলা সদর, উপজেলা সদর, শিল্পাঞ্চল এবং পৌরসভায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বক্তব্যে বলেন,
“এখন যারা নাশকতা করছে, তারা কেউ ছাত্র নয়; তারা সন্ত্রাসী।”
অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধানসহ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সশস্ত্র বাহিনীকে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান।
একই দিন শাহবাগে বিশাল সমাবেশ থেকে প্রথমে ৬ আগস্ট এবং পরে পরিবর্তন করে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হয় এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
৫ আগস্ট: কারফিউ ভেঙে জনস্রোত, তারপর পতন
৫ আগস্ট সকাল থেকেই কারফিউ কার্যকর থাকলেও হাজার হাজার মানুষ ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করেন।
সেনাবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন ছিল। তবে অনেক জায়গায় দেখা যায়, জনতার অগ্রযাত্রা তারা বাধা দিচ্ছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে মানুষের ঢল শাহবাগ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
এর মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেছেন।
পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি সামরিক বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় একটি উড়োজাহাজে করে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন।
এর কিছুক্ষণ পর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন।
বিকেলে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সেনাপ্রধান সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন,
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।”
এই ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে উল্লাস শুরু হয়। গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং জাতীয় সংসদ ভবনে জনতার প্রবেশের ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবরও আসে।
রাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন।
প্রাণহানি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR)-এর তদন্ত প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১,৪০০ জন বলে উল্লেখ করা হয়।
এ সময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, মানবাধিকার সংগঠন এবং বিদেশি সরকারগুলো বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়
মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
৩ আগস্টের ‘এক দফা’ ঘোষণা, ৪ আগস্টের অসহযোগ আন্দোলন এবং ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’—এই তিনটি ঘটনাই ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ২ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই ৭২ ঘণ্টা কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের সময় নয়; বরং এটি ছিল এমন এক অধ্যায়, যা দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণআন্দোলনের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।





