
নিজস্ব প্রতিবেদক | Time tv24
আজ ১৫ আগস্ট, শহীদ আব্দুল মালেকের শাহাদাতবার্ষিকী। বগুড়ার ধুনট উপজেলার খোকসাবাড়ী গ্রামের এই মেধাবী তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ও আদর্শিক চেতনার পক্ষে তাঁর অবস্থানের কারণে তিনি ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৯৪৭ সালের মে মাসে বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার খোকসাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল মালেক। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। শিক্ষাজীবনে তিনি জুনিয়র স্কলারশিপ লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডের মেধাতালিকায় একাদশ স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৯৬৫ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে। মৃত্যুর সময় তিনি এ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষা ও আদর্শিক বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন আব্দুল মালেক। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি নিয়ে ছাত্রসমাজে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হলে তিনি ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
সে সময় শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৯ সালের ২ আগস্ট নূর খান প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি নিয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা নিপা ভবনে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সভায় আব্দুল মালেক ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিকতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য রাখেন।
আব্দুল মালেকের বক্তব্যে শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা, চরিত্র ও মূল্যবোধের সম্পর্ক গুরুত্ব পায়। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল বা একটি ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়; বরং একজন মানুষের নৈতিক ও আদর্শিক চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রেও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষেও তিনি কথা বলেন।
এরপর ১২ আগস্ট শিক্ষানীতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেকটি আলোচনা সভাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, ওই সভায় আব্দুল মালেক অল্প সময়ের জন্য বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান। তাঁর বক্তব্যের পর সভাস্থলে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, সংঘর্ষের একপর্যায়ে রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় আব্দুল মালেক হামলার শিকার হন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আব্দুল মালেকের ওপর হামলা ও তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল এবং এর পেছনে কী ধরনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রেক্ষাপট কাজ করেছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়। ফলে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত কারণ ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় ভিন্নতা রয়েছে।
তবে আব্দুল মালেকের শিক্ষাজীবন ও আদর্শিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে—তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও মননশীল একজন তরুণ। বগুড়ার একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে রাজশাহী বোর্ডের মেধাতালিকায় কৃতিত্বের সঙ্গে স্থান অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে পড়াশোনার সুযোগ পান তিনি। একই সঙ্গে ছাত্রজীবনেই শিক্ষা ও সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের চিন্তা প্রকাশ করেন।
ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে আব্দুল মালেক পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। শিক্ষা, নৈতিকতা ও আদর্শ নিয়ে তাঁর বক্তব্য এবং অল্প বয়সে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা তাঁকে অনুসারীদের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে। প্রতিবছর ১৫ আগস্ট তাঁর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা, দোয়া ও স্মরণ কর্মসূচির আয়োজন করে।
বগুড়ার ধুনট উপজেলার খোকসাবাড়ী থেকে উঠে আসা এই মেধাবী তরুণের জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষা ও আদর্শের বিষয়ে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় করে রেখেছে।
আজ তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে বিভিন্ন সংগঠন ও তাঁর অনুসারীরা শহীদ আব্দুল মালেককে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন। তাঁর মেধাবী শিক্ষাজীবন, ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার পক্ষে অবস্থান এবং ছাত্রজীবনের আদর্শিক ভূমিকা এ দিনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
১৫ আগস্ট | শহীদ আব্দুল মাকের শাহাদাতবার্ষিকী
© Time tv24 — All Rights Reserved






