প্রকাশকাল: ১৬ অক্টোবর ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিয়ের দিন ছিল শুক্রবার। বাদ জুমা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার কথা, আর পরদিন শনিবার দুপুরে আয়োজন করা হয়েছিল বউভাতের। দুই পরিবারে চলছিল শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সাজানো হয়েছিল বাড়ি, আত্মীয়স্বজনকে জানানো হয়েছিল দাওয়াত। কিন্তু বিয়ের আগের রাতেই হঠাৎ মৃত্যু হলো তরুণ প্রকৌশলী আরিফ শাহরিয়ারের (২২)। আনন্দের বদলে এখন দুই পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত পৌনে ৮টার দিকে আরিফের মৃত্যু হয়। তিনি গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানিপাড়ার বাসিন্দা। তাঁর হবু স্ত্রীর বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় এলাকায়।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন আরিফ। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করতেন তিনি। বিয়ের প্রস্তুতির জন্য প্রায় এক মাস আগে বাড়িতে আসেন। দুই পরিবারেই চলছিল বিয়ের আয়োজন। কনের বাড়ির ফটক ও ঘর সাজানো হয়েছিল বর বরণের জন্য। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল দাওয়াতপত্র।
বৃহস্পতিবার রাতে আরিফের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই আনন্দঘন আয়োজনের পরিবর্তে গাইবান্ধা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কফিনে রাখা হয় তাঁর নিথর দেহ।
সংগঠনটির পরিচালক কায়সার প্লাবন বলেন, শনিবার দুপুরে একটি কমিউনিটি সেন্টারে আরিফের বউভাতের আয়োজন ছিল। কিন্তু মুহূর্তেই সব আয়োজন থেমে যায়।
অসুস্থতার পর হাসপাতালে নেওয়া হয় আরিফকে
পরিবারের ধারণা, আরিফ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁর বড় বোন শারমিন সুলতানা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন শহরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে।
শারমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, চার দিন আগে জ্বরে আক্রান্ত হন আরিফ। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে তাঁকে হাসপাতাল রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বেলা ১টার দিকে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে ওষুধ নিয়ে আরিফকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, বিকেলের দিকে আরিফের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারমিনের দাবি, জরুরি বিভাগের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা তাঁকে রিকশায় বসিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে চিকিৎসক পরীক্ষা করেন। রাত পৌনে ৮টার দিকে আরিফকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার
মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক কাইয়ুম মিয়া চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আরিফ তাঁর পরিচিত ছিলেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁকে ওই কেন্দ্রে নেওয়া হলে চিকিৎসক মনির হোসেন গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। তবে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি না করে বাড়িতে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যায় হাসপাতালে নেওয়া হয়।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক মেহেদী হাসান জানান, আরিফকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। স্বজনদের বর্ণনা ও আগের পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে তাঁর কয়েক দিন ধরে টাইফয়েডে আক্রান্ত থাকার বিষয়ে ধারণা পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। চিকিৎসকের ভাষ্য, আরিফের ডেঙ্গুর উপসর্গ ছিল না। স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হুদা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। শুক্রবার সকালে পরিবারের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ওই দিন দুপুরে আরিফের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগের রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি।
জানাজা শেষে দাফন
শুক্রবার বাদ জুমা গাইবান্ধা শহরের রেলস্টেশন জামে মসজিদে আরিফের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে শহরের পৌর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
যে দিন নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল ২২ বছর বয়সী এই তরুণের, সেই দিনেই তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে হলো স্বজনদের। বিয়ের জন্য সাজানো দুই বাড়িতে এখন আনন্দের পরিবর্তে বিরাজ করছে শোকের পরিবেশ।
সম্পাদনা: এমআরইউ






