
ছবি: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান
প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | সোমবার | সকাল ৮:২০ মিনিট
দারিদ্র্য থেকে ক্যাডেট কলেজ, এরপর সাফল্য: ড. আতিউর রহমানের সংগ্রামী জীবনকথা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমানের জীবন যেন দারিদ্র্য, সংগ্রাম, মানুষের সহযোগিতা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য গল্প। জামালপুরের এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নেওয়া আতিউর রহমান ছোটবেলাতেই দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। একসময় অভাবের কারণে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার পর তাকে স্কুল ছেড়ে রোজগারের পথে নামতে হয়েছিল। কিন্তু সেই জীবনই শেষ পর্যন্ত তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
ড. আতিউর রহমানের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর জন্ম জামালপুর জেলার একটি অজপাড়াগাঁয়ে। গ্রামের কাছ থেকে শহরের দূরত্ব ছিল প্রায় ১৪ কিলোমিটার। সেখানে যেতে হতো পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে। পুরো গ্রামের মধ্যে তাঁর চাচা মফিজউদ্দিন ছিলেন একমাত্র মেট্রিক পাস ব্যক্তি।
তাঁর বাবা ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের বড় পরিবারে কোনোরকমে দিন কাটত। দাদার আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও বাবাকে নিজের বাড়িতে ঠাঁই দেননি। ফলে দাদার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি ছনের ঘরে বাবা-মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে থাকতে হতো।
ড. আতিউর রহমান জানান, তাঁর মা বাবার বাড়ি থেকে নানার সম্পত্তির সামান্য অংশ পেয়েছিলেন। সেই অর্থ দিয়ে তিন বিঘা জমি কেনা হয়। জমিটি চাষাবাদের জন্য খুব একটা উপযোগী ছিল না। তবু সেই জমিতে বাবা যে ফসল ফলাতেন, তাতে বছরে পাঁচ-ছয় মাসের খাবার জুটত। খাবারের অভাব, পরনের কাপড়ের অভাব—শৈশবেই দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা তিনি উপলব্ধি করেন।
তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। পরে বাড়ির পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু পরিবারের চরম অভাবের কারণে তৃতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বড় ভাই তারও আগে স্কুল ছেড়ে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তাকেও পরিবারের সহযোগিতায় রোজগারের পথে নামতে হয়।
বাড়িতে একটি গাভী ও কয়েকটি খাসি ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেগুলো মাঠে চরাতেন তিনি। বিকেলে গাভীর দুধ বাজারে নিয়ে বিক্রি করতেন। দুই ভাই মিলে যে আয় করতেন, তাতে কোনোরকমে সংসার চলত। একসময় দুধ বিক্রির আয় থেকে আট টাকা জমিয়ে একটি পান-বিড়ির দোকান দেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে বসে থাকতেন। তখন পড়াশোনায় ফেরার স্বপ্নও যেন হারিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু একটি ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দেয়। একদিন বড় ভাইয়ের সঙ্গে স্কুল মাঠে নাটক দেখতে যান। তখন তাঁর পরনে জামা ছিল না; খালি গায়ে লুঙ্গি পরে নাটক দেখতে গিয়েছিলেন। স্কুলের আনন্দময় পরিবেশ দেখে তাঁর মনে নতুন করে পড়াশোনার ইচ্ছা জাগে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আবার স্কুলে ফিরবেন।
বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি চান। কিন্তু প্রধান শিক্ষক তাঁকে অবজ্ঞা করে বলেছিলেন, “সবাইকে দিয়ে কি লেখাপড়া হয়!” কথাটি তাঁর মনে গভীর দাগ কাটে। শেষ পর্যন্ত বড় ভাইয়ের অনুরোধে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি পান।
পরীক্ষার মাত্র তিন মাস বাকি ছিল। বইপত্র বা পড়ার পরিবেশ কোনোটিই তাঁর ছিল না। তাই এককালের সহপাঠী ও ক্লাসের ফার্স্টবয় মোজাম্মেলের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় চান। মোজাম্মেলের মা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। সেখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয় এবং শুরু হয় নতুন করে পড়াশোনা।
প্রধান শিক্ষকের সেই অবজ্ঞার কথাই যেন তাঁর জন্য জেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ফল প্রকাশের দিন দেখা যায়, তিনি প্রথম হয়েছেন। বড় ভাই আনন্দে কেঁদে ফেলেন। বাড়ি ফেরার পথে গ্রামের মানুষ ও শিশুরা আনন্দ প্রকাশ করে। খবর পেয়ে তাঁর বাবা ছেলেকে পরবর্তী শ্রেণিতে পড়ানোর জন্য ঘরের খাসি ১২ টাকায় বিক্রি করে দেন। সেই টাকা দিয়ে জামালপুর থেকে নতুন বই কিনে দেওয়া হয়।
এরপর তাঁর জীবনে পরিবর্তন আসতে থাকে। শিক্ষকদের স্নেহ ও সহযোগিতা পেতে শুরু করেন। ফয়েজ মৌলভী নামে এক শিক্ষক তাঁকে নিজের সন্তানের মতো দেখাশোনা করতেন। পরে গ্রামের একমাত্র মেট্রিক পাস চাচা মফিজউদ্দিনও তাঁর খোঁজ নেন এবং নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি দিঘপাইত জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তাঁর চাচা শিক্ষকতা করতেন। শিক্ষকরাও তাঁর সংগ্রামের কথা জানতেন এবং তাঁকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করতেন।
অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার সময় চাচার কাছ থেকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন পান। ফরম পূরণ করে পরীক্ষায় অংশ নেন। তখন তাঁর নাম ছিল আতাউর রহমান। কিন্তু স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভর্তি ফরমে তাঁর নাম আতিউর রহমান লিখে দেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই ছেলে একদিন বড় কিছু করবে এবং নামটিও আলাদা হওয়া দরকার।
ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষার জন্য ময়মনসিংহে গিয়ে তিনি অন্যদের পোশাক দেখে সংকোচে পড়ে যান। তাঁর পরনে ছিল পায়জামা ও স্পঞ্জ। পরে ঢাকায় চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় পরার মতো প্যান্টও ছিল না। স্কুলের কেরানি কানাই লাল বিশ্বাসের ফুলপ্যান্ট ধার করে ঢাকায় যান।
মৌখিক পরীক্ষার সময় চাচার শেখানো অনুযায়ী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে অনুমতি চান। তবে এত জোরে বলেছিলেন যে পরীক্ষাকক্ষে থাকা সবাই হেসে ওঠেন। পরীক্ষকদের একজন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ এম. ডব্লিউ. পিট তাঁর অবস্থা বুঝতে পারেন এবং স্নেহের সঙ্গে তাঁকে বসান।
কিছুদিন পর চূড়ান্ত নির্বাচনের চিঠি আসে। কিন্তু নতুন সমস্যা দেখা দেয়। মাসে ১৫০ টাকা বেতন দিতে হবে, যার মধ্যে ১০০ টাকা বৃত্তি হিসেবে পাওয়া যাবে এবং বাকি ৫০ টাকা পরিবারকে দিতে হবে। চরম দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সেই ৫০ টাকা দেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব।
এ সময় এগিয়ে আসেন তাঁর শিক্ষক ফয়েজ মৌলভী। আরও দুই সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি হাটে গিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে সাহায্য চান। কেউ আট আনা, কেউ চার আনা, কেউ এক টাকা, আবার কেউ দুই টাকা করে সহযোগিতা করেন। এভাবে সংগ্রহ হয় ১৫০ টাকা। চাচারাও ৫০ টাকা দেন। সেই অর্থ দিয়ে ড. আতিউর রহমান মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন।
ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার পর তিনি অধ্যক্ষ এম. ডব্লিউ. পিট স্যারকে নিজের আর্থিক অবস্থার কথা জানান। বিষয়টি জানতে পেরে পিট স্যার তাঁর জন্য বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি তোলেন এবং পুরো ১৫০ টাকা বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
পরবর্তী সময়ে এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অর্জন করেন ড. আতিউর রহমান। এরপর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একের পর এক সাফল্য অর্জন করেন এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদেও দায়িত্ব পালন করেন।
নিজের জীবনকে ফিরে দেখে ড. আতিউর রহমান বলেন, তাঁর জীবন সাধারণ মানুষের অনুদান ও সহযোগিতায় ভরপুর। পরবর্তীতে তিনি নিজের এলাকায় স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সাধ্য অনুযায়ী অন্যদেরও সহযোগিতা করেছেন। তবে শৈশবে হাটে গামছা পেতে সংগ্রহ করা সেই ১৫০ টাকার ঋণ তিনি আজও শোধ করতে পারেননি বলে মনে করেন।
তাঁর ভাষায়, সেই ঋণ এতটাই বড় যে সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেও তা শোধ করা সম্ভব নয়।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত — শাপলাপুর নিউজ





