প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার, দুপুর ১২:২২ মিনিট

ঝালকাঠি: ঝালকাঠি–১ (রাজাপুর–কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল নিজ দলের নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ মানসিকতা পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থলোভের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে রফিকুল ইসলাম জামাল লিখেছেন, “ঝালকাঠির বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীদের খাই খাই বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করছি। ছয় মাসে অনেক খেয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের পাহারার বিনিময় খেয়েছেন, আওয়ামীদের পক্ষে ওকালতি করে খেয়েছেন, আওয়ামীদের বাড়িঘর পাহারা দিয়ে খেয়েছেন, ঠিকাদারি পাহারা দিয়ে খেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে আওয়ামীদের দলে যোগদান করিয়েও খাচ্ছেন। মনে হচ্ছে আপনারা দলটাকেই খেয়ে ফেলবেন।”
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ঝালকাঠির রাজনৈতিক অঙ্গনে পোস্টটি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা।
শহীদদের স্মরণ না করায় ক্ষোভ
ফেসবুক পোস্টে বিএনপির এই সংসদ সদস্য আরও উল্লেখ করেন, “লজ্জা থাকা উচিত। যাদের রক্তের বিনিময়ে আপনাদের এত খাওয়ার সুযোগ হয়েছে, সেই ৩৬ জুলাই শহীদদের জন্য ৫ আগস্ট একটু দোয়া–মোনাজাত করতে পারেননি। শুধু নেতা হতে পদের আকাঙ্ক্ষায় থাকলে দ্রুতই দল থেকে ঝরে পড়বেন।”
তার এই মন্তব্যকে দলীয় শৃঙ্খলা, আদর্শ এবং ত্যাগের মূল্যবোধ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
রফিকুল ইসলাম জামালের পোস্ট প্রকাশের পরপরই ঝালকাঠির বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। দলীয় একটি অংশের ধারণা, সাম্প্রতিক কীর্তিপাশা-সংক্রান্ত ঘটনায় অসন্তোষ থেকেই তিনি এমন কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেছেন।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা–কর্মীর অভিযোগ, গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ বিএনপির পদধারী কিছু নেতা দেখভাল করছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পক্ষে বিএনপিপন্থী কয়েকজন আইনজীবী মামলা পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডে দলের আদর্শ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং বিষয়গুলো নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল।
প্রকল্প স্থগিত ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
সম্প্রতি ঝালকাঠি জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং জেলা বিএনপির সদস্যসচিব শাহাদাৎ হোসেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ৪১৭টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাঠান। পরে মন্ত্রণালয় প্রকল্পগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করে।
অভিযোগ ওঠে, ঝালকাঠির দুটি সংসদীয় আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় না করেই এসব প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ঝালকাঠি–১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল এবং ঝালকাঠি–২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা এলেন প্রকল্পগুলো বাতিলের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পৃথক ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) পাঠান বলে জানা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাও জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ মতবিরোধকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত
স্থানীয় সূত্রের দাবি, জেলা বিএনপির সদস্যসচিব শাহাদাৎ হোসেনের সঙ্গে সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালের দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক মতবিরোধ রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সেই দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্যে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যা বললেন রফিকুল ইসলাম জামাল
নিজের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন,
“নেতা–কর্মীদের নৈতিক অবক্ষয় ও দলের প্রতি আনুগত্য অক্ষুণ্ন রাখতে অনেকটা মনে কষ্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মন্তব্য করেছি। আশা করি নেতা–কর্মীরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধারণ করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।”
রাজনৈতিক তাৎপর্য
পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি ক্ষমতাসীন বা বড় রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্য যখন প্রকাশ্যে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থলোভ এবং আদর্শচ্যুতির অভিযোগ তোলেন, তখন সেটি শুধু দলীয় রাজনীতির বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
এদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের একাংশ বিষয়টিকে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে দেখলেও, অন্য একটি অংশ মনে করছে, অভ্যন্তরীণ বিষয় প্রকাশ্যে আনার পরিবর্তে সাংগঠনিকভাবে সমাধান করা উচিত ছিল।
রফিকুল ইসলাম জামালের এই বক্তব্যের পর ঝালকাঠির বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।






