প্রকাশকাল: ২৮ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার | বিকেল ৩:২০ মিনিট
প্রতিবেদক: নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সামরিক বাহিনীর কিছু অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার চাকরিসংক্রান্ত বিষয় পুনর্বিবেচনার অংশ হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী ১৫০ জন কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া বেতন-ভাতা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী।
এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, আবদুল্লাহিল আমান আযমীর নাম গত দেড় দশকে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত সামরিক ও জনপরিসরের ঘটনাগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
কে এই আবদুল্লাহিল আমান আযমী?
আবদুল্লাহিল আমান আযমী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই জনপরিসরে পরিচিত একটি নাম।
সামরিক জীবনে তিনি বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক পর্যায়েও কাজ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রকাশ্য তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
২০০৯ সালে বাধ্যতামূলক অবসর
সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২৪ জুন তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। সে সময় এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি ও প্রশাসনিক আলোচনা চলতে থাকে।
বর্তমান সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেই অবসরের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।
২০১৬ সালে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ
২০১৬ সালের আগস্ট মাসে আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলে তাঁর পরিবার। তবে সে সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য আসে।
পরিবারের দাবি ছিল, তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে কোথায় রাখা হয়েছে সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য জানতে পারেনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। অন্যদিকে সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হয়।
এই ঘটনাটি পরবর্তীতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকারবিষয়ক আলোচনায় স্থান পায়।
দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিতি
২০১৬ সালের পর দীর্ঘ সময় আবদুল্লাহিল আমান আযমী জনসমক্ষে ছিলেন না। তাঁর অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও জল্পনা তৈরি হয়।
পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর সন্ধান দাবি করেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়। তবে এ সময় তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
২০২৪ সালে প্রকাশ্যে ফিরে আসা
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবদুল্লাহিল আমান আযমী আবার জনসমক্ষে আসেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সময় তিনি আটক অবস্থায় ছিলেন এবং সেই সময়ের নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর এসব বক্তব্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব দাবি হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
চাকরিসংক্রান্ত পুনর্বিবেচনা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেয়।
এ লক্ষ্যে একটি পর্যালোচনা শেষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, যেসব কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে বৈষম্য, অবিচার বা প্রশাসনিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
১৫০ কর্মকর্তা এই সুবিধার আওতায়
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী—
- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১৫ জন কর্মকর্তা
- বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২১ জন কর্মকর্তা
- বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ১৪ জন কর্মকর্তা
মোট ১৫০ জন কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তের আওতায় এসেছেন।
তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী স্বাভাবিক অবসর, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হবে।
আবদুল্লাহিল আমান আযমীর পদোন্নতি
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে—
- ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হিসেবে মেজর জেনারেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে।
- ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
- একই সঙ্গে বয়সসীমা অনুযায়ী তাঁকে স্বাভাবিক অবসর প্রদান করা হয়েছে।
আর্থিক সুবিধা
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি পাবেন—
- নির্ধারিত সময়ের বকেয়া বেতন
- প্রাপ্য ভাতা
- পেনশন-সংক্রান্ত সুবিধা
- অন্যান্য আনুষঙ্গিক আর্থিক সুবিধা
- বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে ১ কোটি টাকা
এছাড়া বয়স ও যোগ্যতা অনুযায়ী তাঁকে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদায়নের সুযোগও রাখা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনমনে আলোচনা
এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
একটি অংশের মত হলো, দীর্ঘদিন ধরে যেসব কর্মকর্তা নিজেদের প্রতি অবিচারের অভিযোগ তুলে আসছিলেন, তাঁদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
অন্যদিকে কেউ কেউ পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং সরকারি ব্যয়ের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
সরকারের অবস্থান
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট পর্যালোচনা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, বিধি ও নীতিমালা অনুসারে সুবিধা কার্যকর করা হবে।
উপসংহার
আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে ঘিরে গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে বহু আলোচনা হয়েছে। বাধ্যতামূলক অবসর, দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকা, পরে প্রকাশ্যে ফিরে আসা এবং সর্বশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা—সব মিলিয়ে তাঁর নাম আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
এই বিষয়ে ভবিষ্যতে সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আদালতের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা তথ্য প্রকাশিত হলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

ছবি: মূল ছবি (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী), ডিজিটালভাবে উন্নত করা হয়েছে






