নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটারদের নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর তদন্ত দাবি করেছে দলটি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
নির্বাচন কমিশনে লিখিতভাবে ৯টি অভিযোগ
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, জামায়াতে ইসলামীর একটি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল গত ২৪ অক্টোবর ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে নির্বাচনী পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে নয়টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগের সমর্থনে বিভিন্ন ছবি, আহত ব্যক্তিদের ছবি এবং নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের আলোকচিত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।
দলটির অভিযোগ, নির্বাচনী এলাকায় ধানের শীষ প্রতীকের রঙিন পোস্টার ব্যবহার, নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক দিয়ে প্রচারণা এবং মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে ভোটারদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার এবং বিভিন্ন স্থানে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও করেছে জামায়াত।
ভোটারদের ভয়ভীতি ও হামলার অভিযোগ
প্রেস ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, নির্বাচনী এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার ও সরকারি চাকরিজীবীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এতে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং তাঁরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত ২২ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার আদর্শ স্কুলের সামনে গণসংযোগের সময় জামায়াতের চার নারী কর্মীকে গালিগালাজ ও হেনস্তা করা হয়। এ ছাড়া ২৪ অক্টোবর পৌরসভার হাজীপাড়া এলাকায় এক নারী কর্মীকে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ না নিতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।
একই দিনে ভূল্লী উপজেলার বড়গাঁও ইউনিয়নে জামায়াতের ইউনিয়ন সেক্রেটারি মাসুদ রানার দোকানের সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং কয়েকজনের ওপর হামলার অভিযোগও করেন তিনি। এ ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বেংরোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কুতপার হাট কেন্দ্র এলাকায় জামায়াত কর্মীদের নির্বাচনী কার্যক্রমে বাধা এবং রুহিয়া উপজেলার আখানগর ইউনিয়নের চতুরাখোর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এলাকায় দলটির ব্যানার কেটে নেওয়ার অভিযোগও নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
ইউএনওর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলামের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা, অর্থের বিনিময়ে নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তা এবং ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের দাবি। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের কাছে তিন দফা দাবি
অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
দাবিগুলো হলো—
১. উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রে পুলিশের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েন।
৩. সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শুধু বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করলেই নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হয় না; দায়িত্ব পালনকারীদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে নির্বাচনী এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানানো হয়েছে।
মাগুরা উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ টানলেন গোলাম পরওয়ার
১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, কোনো নির্বাচন বিতর্কিত হলে তার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন যেন কোনোভাবেই মাগুরা উপনির্বাচনের মতো বিতর্কিত পরিস্থিতির দিকে না যায়, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে কমিশনের হাতে থাকা ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি জামায়াত
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, জামায়াতে ইসলামী এখনো নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী এবং তাদের প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী আচরণবিধির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে অভিযোগগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কমিশন তাঁদের বক্তব্য শুনেছে এবং বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। তবে এতে তাঁরা পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি।
বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা ইয়াছিন আরাফাত, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সদস্য শরিফুল আলম জিন্নাহ এবং সাবেক সিনিয়র সচিব খ. ম. কবিরুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: জামায়াতে ইসলামীর প্রেস ব্রিফিংয়ে দেওয়া বক্তব্য। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।






