
৭ অক্টোবর ২০২৬ | বুধবার
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর গভীর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মেধাবী এই শিক্ষার্থী। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল।
আবরার ফাহাদের মৃত্যুর ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে নয়, বরং শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মতো বিষয় নিয়েও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। তাঁর মৃত্যুর পর বুয়েটের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যে ঘটনায় প্রাণ হারান আবরার
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরদিন গভীর রাতে হলের সিঁড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মামলার অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁর ওপর নির্যাতনের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে।
আবরারের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কয়েকটি চুক্তি নিয়ে তাঁর সমালোচনামূলক বক্তব্যও সে সময় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
মামলার বিচার ও বর্তমান অবস্থা
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর ২৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টও বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রাখেন। তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত আসামিরা আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত শুনানি এখনো শুরু হয়নি।
ফলে আবরার ফাহাদ হত্যার সাত বছর পূর্ণ হলেও তাঁর পরিবারের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি। বিশেষ করে দণ্ডিতদের সাজা কার্যকর এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি সামনে রয়েছে।
বিভিন্ন সংগঠনের স্মরণ ও আলোচনা
আবরার ফাহাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পুরান ঢাকার পলাশী এলাকায় স্মরণসভার আয়োজন করেছে। একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনেও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত আলোচনা সভায় দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, জাতীয় স্বার্থ এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাবিদ ও আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেন।
আলোচনায় আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহও বক্তব্য দেন। তাঁর সন্তানের হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন এবং রায় কার্যকরের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে পরিবার।
আবরার ফাহাদের মৃত্যু বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের ইতিহাসে একটি গভীর বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর মৃত্যু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ক্যাম্পাসে সহিংসতা বন্ধের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
সাত বছর পরও আবরার ফাহাদের স্মৃতি ঘিরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর পরিবার ও স্বজনদের প্রত্যাশা—মামলার চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হবে এবং আদালতের রায় যথাযথভাবে কার্যকর হবে।






