
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | শুক্রবার | রাত ১০টা ২৬ মিনিট
বাংলাদেশের ইসলামী বক্তৃতা ও দাওয়াতের অঙ্গনে কিছু মানুষ তাঁদের কণ্ঠ, জ্ঞান ও বক্তব্যের মাধ্যমে দীর্ঘদিন মানুষের মনে জায়গা করে নেন। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছিলেন তেমনই একজন বহুল পরিচিত ইসলামী বক্তা ও মুফাসসির। কোরআনের তাফসির, ইসলামী জীবনব্যবস্থা, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির নানা বিষয় নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের আলোচনা বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাঁর বক্তব্য শুনতে বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা প্রান্তে মানুষের বড় সমাগম হয়েছে। তাঁর কণ্ঠে কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা শুনেছেন এমন মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক।
১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুরে জন্মগ্রহণ করেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই ইসলামী শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসায়ও শিক্ষা গ্রহণ করেন। কোরআন, হাদিস ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমেই গভীর হতে থাকে।
জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি মানুষের কাছে ইসলামের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ওয়াজ মাহফিল ও তাফসিরের মঞ্চ হয়ে ওঠে তাঁর বক্তব্যের প্রধান ক্ষেত্র। বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশক থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর তাফসির মাহফিল ও ইসলামী আলোচনা ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
তাঁর বক্তব্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ ভাষায় মানুষের কাছে ধর্মীয় বিষয় তুলে ধরা। কোরআনের কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি শুধু শব্দের অর্থ বলেই থেমে থাকতেন না; বরং সেই আয়াত মানুষের জীবনের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, একজন মানুষ কীভাবে তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারে—সেসব বিষয়ও তুলে ধরতেন। ঈমান, নামাজ, আখিরাত, চরিত্র, পরিবার, সমাজ ও মানুষের পারস্পরিক দায়িত্ব নিয়ে তাঁর আলোচনায় বারবার গুরুত্ব পেত।
এ কারণেই তাঁর বক্তব্য শুধু একটি ধর্মীয় আলোচনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; অনেক শ্রোতার কাছে তা হয়ে উঠেছিল আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মশুদ্ধির একটি উপলক্ষ। তাঁর বক্তব্য শুনে কেউ নামাজের প্রতি মনোযোগী হয়েছেন, কেউ কোরআন পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়েছেন, আবার কেউ নিজের জীবন ও চরিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন—এমন অভিজ্ঞতার কথা তাঁর অনুসারীদের কাছ থেকে বহুবার শোনা যায়।
তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু মাহফিলের মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একসময় ক্যাসেট ও সিডির মাধ্যমে তাঁর ওয়াজ ও তাফসির ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে ইন্টারনেট, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে। ফলে বহু বছর আগের তাঁর বক্তব্যও আজকের প্রজন্মের কাছে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে।
আল্লামা সাঈদীর পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর লেখালেখি। তাঁর নামে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইসলামী বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এসব লেখায় কোরআনের তাফসিরের পাশাপাশি ঈমান, আমল, আখিরাত, নামাজ, চরিত্র গঠন, পরিবার, সমাজ ও ইসলামী জীবনব্যবস্থার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
তাঁর নামে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘তাফসীরে সাঈদী’ বিশেষভাবে পরিচিত। বিভিন্ন তালিকায় ‘তাফসীরে সাঈদী আমপারা’, ‘তাফসীরে সাঈদী সূরা ফাতিহা’, ‘তাফসীরে সাঈদী সূরা আল-আসর’, ‘তাফসীরে সাঈদী সূরা লুকমান’ এবং ‘তাফসীরে সাঈদী সূরা বাকারাহ’সহ বিভিন্ন গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। কোরআনের বিষয়ভিত্তিক ব্যাখ্যা নিয়ে ‘বিষয়ভিত্তিক তাফসীরুল কোরআন’ নামেও তাঁর নামে গ্রন্থের তালিকা রয়েছে।
কোরআনকে মানুষের জীবন ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও তাঁর লেখায় দেখা যায়। ‘আল কুরআনের দৃষ্টিতে মহাকাশ ও বিজ্ঞান’ নামের গ্রন্থে কোরআনের আলোকে মহাকাশ ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে বিভিন্ন গ্রন্থতালিকায় উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ‘কুরআনুল কারীম’, ‘আল কুরআনের দৃষ্টিতে ইবাদাতের সঠিক অর্থ’, ‘আল কুরআনের মানদণ্ডে সফলতা ও ব্যর্থতা’ এবং ‘কোরআন দিয়ে কোরআন বুঝুন’—এসব নামও তাঁর নামে প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকায় পাওয়া যায়।
মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন ও আখিরাত নিয়েও তাঁর নামে বেশ কিছু বই রয়েছে। ‘আখিরাতের জীবনচিত্র’, ‘ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা’, ‘জান্নাত লাভের সহজ আমল’ এবং ‘চরিত্র গঠনে নামাযের অবদান’—এসব গ্রন্থের নাম থেকেই তাঁর লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। মানুষের ঈমানকে দৃঢ় করা, আমলের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং সুন্দর চরিত্র গঠনের বিষয়ে তাঁর লেখায় গুরুত্ব ছিল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ও হাদিস নিয়েও তাঁর নামে গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। ‘সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন’, ‘রাসূলুল্লাহর মোনাজাত’ এবং ‘হাদীসের আলোকে সমাজ জীবন’—এসব গ্রন্থ তাঁর নামে প্রকাশিত তালিকায় পাওয়া যায়।
পরিবার ও সমাজ নিয়েও তাঁর লেখালেখির উল্লেখ রয়েছে। ‘শিশুর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি’ এবং ‘আমার পরিবারের প্রতি আমার দায়িত্ব’—এ ধরনের গ্রন্থে পরিবার ও সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা এবং পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে বলে বইয়ের তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর বক্তব্যের আরেকটি দিক ছিল মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করা। কঠিন কোনো বিষয়ও তিনি অনেক সময় সহজ উদাহরণ ও স্মরণীয় বাক্যের মাধ্যমে তুলে ধরতেন। তাঁর অনুসারীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি উক্তি হলো, “বিড়ালর মতো ৫০০ বছর বেঁচে থেকে লাভ নাই, সিংহের মতো এক ঘণ্টা বাঁচতে চাই।”
এই কথাটি মূলত জীবনের দৈর্ঘ্যের চেয়ে জীবনের অর্থ ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি অনুপ্রেরণামূলক বার্তা হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকাই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য নয়; বরং অল্প সময়ের জীবনও যদি সাহস, সততা, দায়িত্ববোধ ও মহৎ কাজে পূর্ণ হয়, তাহলে সেই জীবন মানুষের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে—এই ভাবনাই উক্তিটির মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
আল্লামা সাঈদীর বক্তব্যের অনেক অংশ মানুষের মনে এভাবেই জায়গা করে নিয়েছিল। কখনো কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা, কখনো কোনো হাদিসের শিক্ষা, আবার কখনো জীবনের কোনো সাধারণ উদাহরণ—তাঁর উপস্থাপনার ধরন শ্রোতাদের মনোযোগ ধরে রাখত। তাঁর কণ্ঠের আবেগ ও বক্তব্যের সাবলীলতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয় বলে তাঁর অনুসারীরা মনে করেন।
ইসলামী বক্তৃতার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি দলটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি দলটির নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তাঁর সবচেয়ে পরিচিত পরিচয়গুলোর একটি ছিল ইসলামী বক্তা ও মুফাসসির হিসেবে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কোরআনের তাফসির ও ইসলামী শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের রেকর্ড এখনো বিভিন্ন মাধ্যমে সংরক্ষিত রয়েছে। অনেক মানুষ তাঁর পুরোনো তাফসির ও ওয়াজ শুনে থাকেন এবং তাঁর স্মরণীয় কথাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪০ মিনিটে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে তাঁর অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়।
একজন মানুষের জীবনকে শুধু তাঁর পরিচয়ের তালিকা দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর বলা কথা, লেখা বই, মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতিও সেই জীবনের অংশ হয়ে থাকে। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ক্ষেত্রেও তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতা, তাফসির, গ্রন্থ রচনা এবং মানুষের মাঝে ধর্মীয় জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর নামে প্রকাশিত ‘তাফসীরে সাঈদী’, ‘বিষয়ভিত্তিক তাফসীরুল কোরআন’, ‘আল কুরআনের দৃষ্টিতে মহাকাশ ও বিজ্ঞান’, ‘কুরআনুল কারীম’, ‘আখিরাতের জীবনচিত্র’, ‘ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা’, ‘জান্নাত লাভের সহজ আমল’, ‘চরিত্র গঠনে নামাযের অবদান’, ‘সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন’, ‘রাসূলুল্লাহর মোনাজাত’, ‘হাদীসের আলোকে সমাজ জীবন’, ‘শিশুর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি’ এবং ‘আমার পরিবারের প্রতি আমার দায়িত্ব’সহ বিভিন্ন গ্রন্থ তাঁর লেখালেখির বিস্তৃত পরিসরকে তুলে ধরে।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা বহু বক্তব্য, তাফসিরের রেকর্ড এবং তাঁর নামে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ এখনো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তাঁর অনুসারীদের কাছে তাঁর স্মৃতি শুধু একজন বক্তার স্মৃতি নয়; বরং কোরআনের তাফসির, ইসলামী শিক্ষা ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি।
জীবন ক্ষণস্থায়ী—এই কথাটি তিনি তাঁর বক্তব্যে বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। আর তাঁর বহুল স্মরণীয় সেই কথাটি যেন সেই ভাবনাকেই আরও সহজ করে বলে যায়—“বিড়ালের মতো ৫০০ বছর বেঁচে থেকে লাভ নাই, সিংহের মতো এক ঘণ্টা বাঁচতে চাই।”
হয়তো একটি জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার দৈর্ঘ্যে নয়, বরং সে জীবন কতটা অর্থবহ ছিল, কত মানুষের মনে আলোড়ন তুলেছিল এবং কত স্মৃতি রেখে গেছে—সেখানেই।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দীর্ঘ ইসলামী বক্তৃতা, তাফসির, লেখালেখি এবং মানুষের মাঝে ধর্মীয় জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ইসলামী বক্তৃতার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
© Time TV24 — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।





